(এই লেখাটা উন্মাদে ডিসেম্বর, ২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিলো)
বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়। কথাটা কি কেবল গাছের বেলায়ই সত্য? বোধহয়। না হলে মানুষ তার নাম নিয়ে এত ব্যস্ত কেন? সবাই ছুটছে হয় নিজের নাম, না হয় প্রতিষ্ঠানের নাম, আরও বৃহত্তর স্বার্থে হলে দেশের নামের জন্য। মোদ্দাকথা, নামটাই হলো আসল। এই নামেরও আবার বলিহারি; কারোর নিজের নাম নিয়ে খুবই খুঁতখুঁতানি, কারোর আবার নিজের নামটা বেশ পছন্দ- কিন্তু সেই নামে রাস্তায় চিৎকার দিলে অন্তত জনাদশেক সাড়া দেবে! আমি অবশ্য সেইদিক দিয়ে বেশ ভালোই আছি, আমার ডাকনাম শিহাব, রাস্তা-ঘাটে এই নামে চিৎকার করলে বড়জোর দুইতিন জন সাড়া দেবে, এর বেশী নয়। মানুষজন সাড়া দিতে থাকুক, এই ফাঁকে আমরা বরং বহু বছর আগের একটা ছোট্ট চিত্র নাট্যে চলে যাই-
হাফপ্যান্ট পরা বালক : কাকা আমাকে পার্সেলে বিরিয়ানী দ্যান।
বিরিয়ানি বিক্রেতা কাকা : আরে বাবু, কোন বাড়িত থন আইছো? কি নাম তুমার? কয় প্যাকেট বিরিয়ানী লাগবো?
হাফপ্যান্ট পরা বালকের মনে স্ট্রাইক করলো দ্বিতীয় প্রশ্নটাই।
বিড়বিড় করে বললো : আমার নাম শিহাব। (বলাইবাহুল্য, ওই হাফপ্যান্ট পরা বালক আমি নিজেই)
বিরিয়ানি বিক্রেতা কাকা : এই নেও তোমার বিরিয়ানী। টাকা সামনের ক্যাশে দিয়া যাও।
এই লোক কিভাবে বুঝলো আমি কয় প্যাকেট বিরিয়ানী নেব এই প্রশ্ন তখন আমার মাথায় খেললো না। নিজের নাম বলতে পারার আনন্দেই তখন আমি খুশি। নাচতে নাচতে বিরিয়ানীর প্যাকেট নিয়ে বাসায় গেলাম। অবশ্য বাসায় গিয়ে নাচ বন্ধ হয়ে গেলো। বড়ভাই গম্ভীর মুখে বললো- ‘তোকে আট প্যাকেট আনতে বললাম আর তুই কি বুঝে এই দুই প্যাকেট আনলি? আবার দোকানে যা, ভালো করে আট প্যাকেট নিয়ে আয়। এটা তোর বাইরে ঘোরাঘুরির ট্রেনিং সেশন।’ আসলে ট্রেনিং না ছাই- এই বিরিয়ানী আনা ছিলো বড়ভাইয়েরই কাজ, আমাকে পেয়ে ফাঁকিবাজির প্র্যাকটিস করে নিচ্ছিলো আর কি।
আবার গেলাম বিরিয়ানির দোকানে-
আমি : কাকা আমাকে তো আপনে আট প্যাকেট দ্যান নাই।
বিরিয়ানি বিক্রেতা কাকা : আট প্যাকেট তুমি কখন চাইলা? তুমি তো কইলা দুই হাফ।
আমি : আমি কখন দুই হাফ বললাম? আমিতো বললাম... আমিতো বললাম...
বিরিয়ানি বিক্রেতা কাকা : তুমি তো কইলা... কি?
আমি : আমিতো বললাম আমার নাম শিহাব!
‘শিহাব নাকি দুই হাফ’- বিরিয়ানীওয়ালার সাথে এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলো, সেই সাথে ছোট বয়সেই আমার একটা তালিম হযে গেলো- নাম বলতে সাবধান!
যথাসময়ে স্কুলে ভর্তি হলাম। স্কুলের দশটা বছর নিজের নামে আমি একাই রাজত্ব করে এলাম। কলেজেও তাই, এমনকি ইউনিভার্সিটিতেও ভর্তি হয়ে দেখলাম, আমি ছাড়া আমার নামে প্রক্সি দেয়ার কেউ নেই। একেবারে ফাঁকা। সমস্যা হলো গ্র্যাজুযেশন শেষ করে মাস্টার্সের ক্লাসে গিয়ে। ক্লাসে ঢুকে দেখি আমার নামের আরেকজন দাবীদার সীট আলো করে বসে রয়েছে। প্রথমদিনেই ক্লাসের মধ্যে হাউকাউ বেঁধে গেলো। স্যার কাউকে ডাকলে আমরা দুজনেই ‘ইয়েস স্যার’ বলে লাফিয়ে উঠি, আবার পড়া জিজ্ঞেস করতে ডাকলে দু’জনেই উদাসীন মুখে এ ওর দিকে তাকাই। ক্লাস শেষ করার পরে ছাত্রদের সবার মিটিং বসলো। মিটিংয়ে ঠিক হলো- ঐ শিহাব হবে শিহাব এক, আর আমি হবো শিহাব দুই। আমি তৎক্ষণাৎ আবার হাউকাউ লাগিয়ে দিলাম। আমি হবো দুই নাম্বার শিহাব? কখনো না। এক নাম্বার হলে আছি, না হলে নাই। ঐ শিহাবও ভেটো দিলো- এক নাম্বার না হলে সেও নাই। অতএব সভা এবার সিদ্ধান্ত নিলো বিকল্প নামকরণের। চেহারাসুরত দেখে নাম ঠিক করা হবে। প্রথমে আসলো উচ্চতার হিসাব- তাহলে ঐ শিহাবের নাম হবে লম্বা শিহাব। তবে আমি কি হবো- বাইট্টা শিহাব? না... আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। তাহলে ঐ শিহাবের নাম হোক চিকনা শিহাব। -সভার প্রস্তাব। তখন আমি কি- মোটকু শিহাব? কখনো না- আমার আবার চিৎকার করতে হলো। এবার আমিই প্রস্তাব দিলাম- ‘বরং ওর নাম দেয়া হোক ফরসা শিহাব।’ নিজের রঙের ওপর একটু ভরসা ছিলো, হয়তো আমার নাম হতে পারে শ্যামলা শিহাব। আরেক বন্ধু জবাব দিলো- ‘তাহলে তোর নাম কি হবে? পাতিলের তলা শিহাব?’ বাংলায় একটা কথা খুব প্রচলিত- তব্ধা মেরে যাওয়া, আমি সেটাই মেরে গেলাম। অবশ্য এই তব্ধা মেরে যাওয়ায় কাজ হলো, মিটিংয়ে ডিসিশন হলো দুজনেরই নাম হবে শুধু শিহাব। আগে পিছে কিছু থাকবেনা। আমার খালি ইচ্ছে হচ্ছিলো ব্যাটাকে একটা ঝাড়ি মেরে বসিয়ে দেই, কিন্তু সবার সামনে আর সেটা করা গেলো না।
আস্তে আস্তে মাস্টার্সের পড়াশোনাও এগিয়ে চললো, আর কিভাবে কিভাবে যেন ঐ শিহাবের সাথে আমার একটু একটু বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। ভালোই চলছিলো ক্লাস, একদিন ঐ শিহাব এসে সিরিয়াস মুখে বললো, ‘অ্যাই শিহাব, বিসিএস দিবা?’ আমি কিছু চিন্তা না করেই বললাম, ‘হ্যাঁ, দিবো।’ ‘ওকে, তাহলে কালকে বইপত্র নিয়ে টিএসসি চলে আসো।’ তো পরদিন বইখাতা নিয়ে টিএসসি চলে গেলাম। শুরু হয়ে গেলো কঠিন পড়াশোনা- আমার না, তার। কিছুদিন পড়াশোনা করে বুঝলাম সে কঠিন চিজ। মুখ দিয়ে একবার যখন বলেছে, বিসিএসে টিকেই সে ছাড়বে। আমরা যখন সকালে ভার্সিটি এসে চা-টা খেয়ে টিএসসিতে পড়তে যাই, ততক্ষণে সে লাইব্রেরীতে তিন-চার ঘণ্টা পড়াশোনা করে এসেছে। টিএসসিতে বসে আমরা আর সবাই আড্ডা মারি, সে কঠিন মুখে পড়াশোনা করে যায়। আর টিএসসির আড্ডা শেষে আমরা যখন বৈকালিক আড্ডা মারতে যাই, সে তখন টেস্ট পেপার খুলে মডেল টেস্ট দিতে বসে। অবশেষে বিসিএস পরীক্ষার আগে আগে দেখা গেলো সে সব জানে। মাচুপিচ্চুতে কিসের কিসের খনি পাওয়া যায়, কিংবা নেতানিয়াহুর বাবার নাম কি- সবই তার ঠোঁটস্থ। তার তুলনায় আমি গোষ্পদ বিশেষ, কিছুই জানি না। একটা ছেলে এত জানবে ক্যান?- রাগে ব্যাটাকে ঝাড়ি মারার ইচ্ছেটা চিকনে আবার ফিরে আসতে লাগলো, তবে দেই দিচ্ছি করে ঝাড়িটা আর দেয়া হয়ে উঠলো না। প্রাথমিক পরীক্ষা হয়ে গেলো, যথারীতি আমি বাদ, আর ঐ শিহাব রিটেন পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণ।
এরপর বেশ কিছুদিন চলে গেলো। আমাদের সবারই পড়াশোনা শেষ, যে যার মতো ব্যস্ত। আমি অফিসে বসে একটা জরুরী কাজ করছি, এমন সময় মোবাইলে টুট টুট কল। একটা আননোন নাম্বার থেকে। আমি কিছুটা ব্যস- হয়েই ফোন ধরলাম- হ্যালো। ওপাশ থেকে গলা ভেসে এলো- ‘হ্যালো শিহাব শিহাব, শিহাব বলছি।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম- কে বলছেন? আবার উত্তর- ‘হ্যালো শিহাব শিহাব, শিহাব বলছি।’ বিরক্তের একশেষ হয়ে ঝাড়ি দিয়ে বললাম- ‘কে এইটা? এইসব ফাত্রামির মানে কি?’ ওপাশ থেকে ধাতস্থ হয়ে বললো- ‘ওহ্ তুমি বুঝতে পারো নাই, আমি তোমার মিতা, শিহাব বলছি। শোন আজকে বিসিএসের ফাইনাল রেজাল্ট দিছে। আমি ছেচল্লিশতম হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হইছি। দোয়া রাইখো।’ খটাশ করে ফোন রেখে দিলো। আমি হতবিহবল হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। করলাম কি? ম্যাজিস্ট্রেটকে ঝাড়ি দিয়ে দিলাম? তবে আরেকটা কথা মনে হওয়ায় আবার উল্লসিত হয়ে উঠলাম- একটা ভালো কাজ হয়েছে। আমার আজন্ম লালিত স্বপ্ন- ঐ ব্যাটাকে একটা ঝাড়ি দিয়ে দেয়া গেছে! নামের বিড়ম্বনার একটা হলেও ভালো ফল পেলাম। ভালোর এই আকালের দিনে এটাই বা কম কি!