শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

ট্র্যাশবিন

(এই লেখাটা উন্মাদে ডিসেম্বর, ২০১১ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিলো)

  বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়। কথাটা কি কেবল গাছের বেলায়ই সত্য? বোধহয়। না হলে মানুষ তার নাম নিয়ে এত ব্যস্ত কেন? সবাই ছুটছে হয় নিজের নাম, না হয় প্রতিষ্ঠানের নাম, আরও বৃহত্তর স্বার্থে হলে দেশের নামের জন্য। মোদ্দাকথা, নামটাই হলো আসল। এই নামেরও আবার বলিহারি; কারোর নিজের নাম নিয়ে খুবই খুঁতখুঁতানি, কারোর আবার নিজের নামটা বেশ পছন্দ- কিন্তু সেই নামে রাস্তায় চিৎকার দিলে অন্তত জনাদশেক সাড়া দেবে! আমি অবশ্য সেইদিক দিয়ে বেশ ভালোই আছি, আমার ডাকনাম শিহাব, রাস্তা-ঘাটে এই নামে চিৎকার করলে বড়জোর দুইতিন জন সাড়া দেবে, এর বেশী নয়। মানুষজন সাড়া দিতে থাকুক, এই ফাঁকে আমরা বরং বহু বছর আগের একটা ছোট্ট চিত্র নাট্যে চলে যাই-

হাফপ্যান্ট পরা বালক : কাকা আমাকে পার্সেলে বিরিয়ানী দ্যান।
বিরিয়ানি বিক্রেতা কাকা : আরে বাবু, কোন বাড়িত থন আইছো? কি নাম তুমার? কয় প্যাকেট বিরিয়ানী লাগবো?
হাফপ্যান্ট পরা বালকের মনে স্ট্রাইক করলো দ্বিতীয় প্রশ্নটাই।
বিড়বিড় করে বললো : আমার নাম শিহাব। (বলাইবাহুল্য, ওই হাফপ্যান্ট পরা বালক আমি নিজেই)
বিরিয়ানি বিক্রেতা কাকা : এই নেও তোমার বিরিয়ানী। টাকা সামনের ক্যাশে দিয়া যাও।
এই লোক কিভাবে বুঝলো আমি কয় প্যাকেট বিরিয়ানী নেব এই প্রশ্ন তখন আমার মাথায় খেললো না। নিজের নাম বলতে পারার আনন্দেই তখন আমি খুশি। নাচতে নাচতে বিরিয়ানীর প্যাকেট নিয়ে বাসায় গেলাম। অবশ্য বাসায় গিয়ে নাচ বন্ধ হয়ে গেলো। বড়ভাই গম্ভীর মুখে বললো- ‘তোকে আট প্যাকেট আনতে বললাম আর তুই কি বুঝে এই দুই প্যাকেট আনলি? আবার দোকানে যা, ভালো করে আট প্যাকেট নিয়ে আয়। এটা তোর বাইরে ঘোরাঘুরির ট্রেনিং সেশন।’ আসলে ট্রেনিং না ছাই- এই বিরিয়ানী আনা ছিলো বড়ভাইয়েরই কাজ, আমাকে পেয়ে ফাঁকিবাজির প্র্যাকটিস করে নিচ্ছিলো আর কি।

আবার গেলাম বিরিয়ানির দোকানে-
আমি     : কাকা আমাকে তো আপনে আট প্যাকেট দ্যান নাই।
বিরিয়ানি বিক্রেতা কাকা : আট প্যাকেট তুমি কখন চাইলা? তুমি তো কইলা দুই হাফ।
আমি     : আমি কখন দুই হাফ বললাম? আমিতো বললাম... আমিতো বললাম...
বিরিয়ানি বিক্রেতা কাকা : তুমি তো কইলা... কি?
আমি             : আমিতো বললাম আমার নাম শিহাব!

‘শিহাব নাকি দুই হাফ’- বিরিয়ানীওয়ালার সাথে এই ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলো, সেই সাথে ছোট বয়সেই আমার একটা তালিম হযে গেলো- নাম বলতে সাবধান!

যথাসময়ে স্কুলে ভর্তি হলাম। স্কুলের দশটা বছর নিজের নামে আমি একাই রাজত্ব করে এলাম। কলেজেও তাই, এমনকি ইউনিভার্সিটিতেও ভর্তি হয়ে দেখলাম, আমি ছাড়া আমার নামে প্রক্সি দেয়ার কেউ নেই। একেবারে ফাঁকা। সমস্যা হলো গ্র্যাজুযেশন শেষ করে মাস্টার্সের ক্লাসে গিয়ে। ক্লাসে ঢুকে দেখি আমার নামের আরেকজন দাবীদার সীট আলো করে বসে রয়েছে। প্রথমদিনেই ক্লাসের মধ্যে হাউকাউ বেঁধে গেলো। স্যার কাউকে ডাকলে আমরা দুজনেই ‘ইয়েস স্যার’ বলে লাফিয়ে উঠি, আবার পড়া জিজ্ঞেস করতে ডাকলে দু’জনেই উদাসীন মুখে এ ওর দিকে তাকাই। ক্লাস শেষ করার পরে ছাত্রদের সবার মিটিং বসলো। মিটিংয়ে ঠিক হলো- ঐ শিহাব হবে শিহাব এক, আর আমি হবো শিহাব দুই। আমি তৎক্ষণাৎ আবার হাউকাউ লাগিয়ে দিলাম। আমি হবো দুই নাম্বার শিহাব? কখনো না। এক নাম্বার হলে আছি, না হলে নাই। ঐ শিহাবও ভেটো দিলো- এক নাম্বার না হলে সেও নাই। অতএব সভা এবার সিদ্ধান্ত নিলো বিকল্প নামকরণের। চেহারাসুরত দেখে নাম ঠিক করা হবে। প্রথমে আসলো উচ্চতার হিসাব- তাহলে ঐ শিহাবের নাম হবে লম্বা শিহাব। তবে আমি কি হবো- বাইট্টা শিহাব? না... আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। তাহলে ঐ শিহাবের নাম হোক চিকনা শিহাব। -সভার প্রস্তাব। তখন আমি কি- মোটকু শিহাব? কখনো না- আমার আবার চিৎকার করতে হলো। এবার আমিই প্রস্তাব দিলাম- ‘বরং ওর নাম দেয়া হোক ফরসা শিহাব।’ নিজের রঙের ওপর একটু ভরসা ছিলো, হয়তো আমার নাম হতে পারে শ্যামলা শিহাব। আরেক বন্ধু জবাব দিলো- ‘তাহলে তোর নাম কি হবে? পাতিলের তলা শিহাব?’ বাংলায় একটা কথা খুব প্রচলিত- তব্ধা মেরে যাওয়া, আমি সেটাই মেরে গেলাম। অবশ্য এই তব্ধা মেরে যাওয়ায় কাজ হলো, মিটিংয়ে ডিসিশন হলো দুজনেরই নাম হবে শুধু শিহাব। আগে পিছে কিছু থাকবেনা। আমার খালি ইচ্ছে হচ্ছিলো ব্যাটাকে একটা ঝাড়ি মেরে বসিয়ে দেই, কিন্তু সবার সামনে আর সেটা করা গেলো না।

আস্তে আস্তে মাস্টার্সের পড়াশোনাও এগিয়ে চললো, আর কিভাবে কিভাবে যেন ঐ শিহাবের সাথে আমার একটু একটু বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। ভালোই চলছিলো ক্লাস, একদিন ঐ শিহাব এসে সিরিয়াস মুখে বললো, ‘অ্যাই শিহাব, বিসিএস দিবা?’ আমি কিছু চিন্তা না করেই বললাম, ‘হ্যাঁ, দিবো।’ ‘ওকে, তাহলে কালকে বইপত্র নিয়ে টিএসসি চলে আসো।’ তো পরদিন বইখাতা নিয়ে টিএসসি চলে গেলাম। শুরু হয়ে গেলো কঠিন পড়াশোনা- আমার না, তার। কিছুদিন পড়াশোনা করে বুঝলাম সে কঠিন চিজ। মুখ দিয়ে একবার যখন বলেছে, বিসিএসে টিকেই সে ছাড়বে। আমরা যখন সকালে ভার্সিটি এসে চা-টা খেয়ে টিএসসিতে পড়তে যাই, ততক্ষণে সে লাইব্রেরীতে তিন-চার ঘণ্টা পড়াশোনা করে এসেছে। টিএসসিতে বসে আমরা আর সবাই আড্ডা মারি, সে কঠিন মুখে পড়াশোনা করে যায়। আর টিএসসির আড্ডা শেষে আমরা যখন বৈকালিক আড্ডা মারতে যাই, সে তখন টেস্ট পেপার খুলে মডেল টেস্ট দিতে বসে। অবশেষে বিসিএস পরীক্ষার আগে আগে দেখা গেলো সে সব জানে। মাচুপিচ্চুতে কিসের কিসের খনি পাওয়া যায়, কিংবা নেতানিয়াহুর বাবার নাম কি- সবই তার ঠোঁটস্থ। তার তুলনায় আমি গোষ্পদ বিশেষ, কিছুই জানি না। একটা ছেলে এত জানবে ক্যান?- রাগে ব্যাটাকে ঝাড়ি মারার ইচ্ছেটা চিকনে আবার ফিরে আসতে লাগলো, তবে দেই দিচ্ছি করে ঝাড়িটা আর দেয়া হয়ে উঠলো না। প্রাথমিক পরীক্ষা হয়ে গেলো, যথারীতি আমি বাদ, আর ঐ শিহাব রিটেন পরীক্ষার জন্য উত্তীর্ণ।

এরপর বেশ কিছুদিন চলে গেলো। আমাদের সবারই পড়াশোনা শেষ, যে যার মতো ব্যস্ত। আমি অফিসে বসে একটা জরুরী কাজ করছি, এমন সময় মোবাইলে টুট টুট কল। একটা আননোন নাম্বার থেকে। আমি কিছুটা ব্যস- হয়েই ফোন ধরলাম- হ্যালো। ওপাশ থেকে গলা ভেসে এলো- ‘হ্যালো শিহাব শিহাব, শিহাব বলছি।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম- কে বলছেন? আবার উত্তর- ‘হ্যালো শিহাব শিহাব, শিহাব বলছি।’ বিরক্তের একশেষ হয়ে ঝাড়ি দিয়ে বললাম- ‘কে এইটা? এইসব ফাত্রামির মানে কি?’ ওপাশ থেকে ধাতস্থ হয়ে বললো- ‘ওহ্‌ তুমি বুঝতে পারো নাই, আমি তোমার মিতা, শিহাব বলছি। শোন আজকে বিসিএসের ফাইনাল রেজাল্ট দিছে। আমি ছেচল্লিশতম হয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হইছি। দোয়া রাইখো।’ খটাশ করে ফোন রেখে দিলো। আমি হতবিহবল হয়ে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। করলাম কি? ম্যাজিস্ট্রেটকে ঝাড়ি দিয়ে দিলাম? তবে আরেকটা কথা মনে হওয়ায় আবার উল্লসিত হয়ে উঠলাম- একটা ভালো কাজ হয়েছে। আমার আজন্ম লালিত স্বপ্ন- ঐ ব্যাটাকে একটা ঝাড়ি দিয়ে দেয়া গেছে! নামের বিড়ম্বনার একটা হলেও ভালো ফল পেলাম। ভালোর এই আকালের দিনে এটাই বা কম কি!

সোমবার, ২১ নভেম্বর, ২০১১

পিংকসিটিতে দিন-রজনী


(এই লেখাটা পিংকসিটি এজিএম ২০১১ এর জন্য বের হওয়া পত্রিকায় প্রকাশিত)
এখন থেকে প্রায় ছয় বছর আগের কথাআব্বা-আম্মা এক সন্ধ্যায় বাইরে থেকে বাসায় আসলেনআম্মার মুখে বিশ্ব জয় করার হাসিআব্বার মুখেও সারপ্রাইজ দেয়ার মুচকি মুচকি হাসিআমরা সবাই চেপে ধরলাম, ব্যাপারটা কি? দুই-এক মিনিট রহস্য-রহস্য ভাব রাখার পর তারা আর চেপে রাখতে পারলেন না, বলেই দিলেন- আমাদের নাকি একটা বাড়ি হতে যাচ্ছে, দোতলা বাড়িকোথায় হবে? খিলক্ষেতের ভেতর পিংকসিটিতেচটপট প্ল্যান হয়ে গেলো, আগামীকাল আমরা পিংকসিটিতে যাচ্ছি

পরদিন গেলাম পিংকসিটি
এখানকার সুপারভাইজার সাহেব আমাদের খুব খাতির করে নিয়ে গেলেন এক নদীর ধারেএরপর আঙুল তুলে বললেন, “ওই যে নদীর মাঝখানটা দেখতে পাচ্ছেন, ওইখানেই হবে আপনাদের বাড়িবাড়ির জায়গা দেখাতে পেরে সুপারভাইজারও খুশি, আমরাও খুশিতাড়াতাড়ি অফিসে গিয়ে প্রথম ডাউনপেমেন্ট পরিশোধ করলামতারপর খুশি উদযাপন করতে আমরা শিক-কাবাব কিনলাম, নান রুটি কিনলাম, কোক কিনলামবাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া হবেখুব ফুরফুরে আনন্দে বাসায় ফিরলামটিভি ছেড়ে সবাই খেতে বসলামটিভিতে তখন অ্যাড দেখাচ্ছে- এক লোক নদীর ধারে গিয়ে একটা ফ্যামিলিকে ঠিক আমাদের মতো করেই দেখাচ্ছে, “ওই যে নদীর মাঝখানটা দেখতে পাচ্ছেন, ওইখানেই হবে আপনাদের বাড়িএরপরই পর্দায় ভেসে উঠলো সতর্কবাণী- এইসব ধাপ্পাবাজীতে ভুলবেন নানগদ তৈরী বাড়িতে এখনই উঠে পড়ুন, আপনাদের সেবায় অমুক হাউজিং লিমিটেড!!! এই অ্যাড দেখার পর আমাদের সেদিনের শিক কাবাবের পার্টিটা আর তেমন জমলো না, গম্ভীর মুখে সবাই খাওয়া শেষ করলাম, একটা চাপা দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে গেলামপিংকসিটি নিয়ে আমাদের সুখ আর দুঃখ মেশানো দিন-রজনী আসলে সেদিন থেকেই শুরু হয়ে গেলো

এরপর দিন গড়িয়ে বেশ কিছু সময় গেলো
পানি ভরাট করে মাটি ফেলে একদিন সত্যি সত্যিই বাড়ি উঠে গেলো, আর সত্যি সত্যিই আমরা বাড়িতে উঠে এলামকিন্তু ওঠার পরদিন থেকেই মনে হলো আমরা মূল ঢাকা শহর থেকে একটু দূরে চলে এসেছিমনে হওয়ার কারণ দুটিপ্রথম কারণ, পিংকসিটিতে কোন কাক নেই! সত্যি সত্যিই নেই আজকাল গ্রামাঞ্চলেও কাক ডাকাডাকি করে, আর পিংকসিটির মতোন একটা মডেল টাউনে আমার প্রথম সকালে ঘুম ভাঙলো চড়ুইয়ের কিচিরমিচির শুনে! সারা জীবনে শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে কাকের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙার কু-অভ্যাস, হঠাৎ করেই চড়ুইয়ের মিষ্টি কিচিরমিচিরকেই মনে হলো রীতিমতো কর্কশআর দ্বিতীয় কারণ হলো আমাদের পেপারওয়ালাভুল হয়ে গেলো, বলা উচিৎ শাহী পেপারওয়ালাআজকাল মফস্বল শহরেও দৈনিক পত্রিকাগুলো সকাল দশটার মধ্যে সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়এখানে এগারোটার মধ্যে পেপার হাতে পেলেই মনে হয় মহা সৌভাগ্যবানআর ঈদ, বড়দিন, পূজা-পার্বন কিংবা নববর্ষের ছুটিগুলোও তিনি পালন করেন বেশ লম্বা লম্বা করেই

তাহলে পিংকসিটি কি একটা গণ্ডগ্রাম
? হলোই বা, নিজেকেই স্বান্তনা দেই- সারা বিশ্বটাইতো এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজএসব ভাবতে ভাবতে পিংকসিটির রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ দেখি গ্লোবাল ভিলেজ আমার চোখের সামনে! সামনেই ফুটবল নিয়ে খেলছে দুই বৃটিশ শিশু, এক বাড়ির লনে চিং-ওয়া-চু জাতীয় শব্দ করে ফোনে কথা বলছে এক চায়নিজ, রাস্তায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে কথা বলছে দুই নাইজেরিয়ান, বৈকালিক হাঁটাহাঁটিতে ব্যস্ত এক রাশিয়ান গৃহবধূমনের ভুল ধারণা শুধরে নিলামপিংকসিটিকে বরং বলা উচিৎ একটা ছোটখাট কসমোপলিটান সিটিএই ধারণা নিয়েই আবার হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বাসায়


কিন্তু কসমোপলিটন সিটির ধারণা আমার মনে খুব বেশীদিন টিকলো নাকারণ এরমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পিংকসিটি-বসুন্ধরা ধুড়ুম-ধাড়ুম যুদ্ধসন্ধ্যেবেলা গেটের দারোয়ানের কাছে মিনি ইন্টারভিউ দিয়ে ঢুকি, আর রাত্রিবেলা গুলি-গোলার শব্দ শূনে আল্লাহ-আল্লাহ করে কাটাইসন্দেহজনক চেহারার একগাদা লোক দিনরাত এসে ঘোরাঘুরি শুরু করলো, তাদের জন্য মহা আয়োজনে রান্নাবান্না হতে লাগলোগোটা পিংকসিটিটাকেই কেমন যেন দূর্গ-দূর্গ মনে হওয়া শুরু করলো, আর আমরা যেন সেখানকার অনাহূত দূর্গবাসীতবে বিপদের সময় বলেই বোধহয়, সবাই একসাথে এককাট্টা হয়ে গেলামআমাদের করণীয় সম্পর্কে ঘন ঘন মিটিং হতে লাগলো, সেইসাথে সবার সম্পর্কটাও যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠতে লাগলোঅবশ্য লড়াই শেষ হবার পর দূর্গ দূর্গ ভাবটা আর থাকলো না

একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে গিয়ে বেশ অবাক হলাম
পেল্লায় সাইজের আম কেটে রাখাআম কোথথেকে এলো? “পাশের বাসার ভাবী দিয়ে গেলেন” - আম্মার উত্তর কয়েকদিন পর রাতের বেলা খেতে গিয়ে দেখি কুমড়ো পাতার বড়া, সেটাও শুনলাম পাশের এক বাড়ি থেকে দিয়ে গ্যাছে! এইভাবে মাঝেমধ্যেই খাবার টেবিলে কিছু না কিছু থাকা শুরু করলোধীরে ধীরে আমাদের লাগানো গাছপালা-শাকসবজীগুলোও বড় হয়ে উঠলো আর আমরাও এই আদান-প্রদান সংস্কৃতির সাথে খুব ভালোভাবে যুক্ত হয়ে গেলাম ব্যাপারটা কেবল খাবার-দাবার আদান-প্রদানের মধ্যেই আটকে থাকলো নাপিংকসিটির মধ্যেই একজনের গায়ে-হলুদ হবে, আগেকার দিনের সিনেমায় মালকা বানুর বিয়েতে সারা গ্রাম যেমন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো গেট সাজাতে, তেমনি এইখানেও দেখলাম গেট সাজানো আর স্টেজ বানানো নিয়ে সবার দুশ্চিন্তা! খাওয়া-দাওয়ার তদারকির জন্য এবাড়ি-ওবাড়ি মিলিয়ে দশজন রেডি! এক বাড়িতে গৃহকর্তার আম্মা মারা গেছেন, মনে হলো সারা পিংকসিটি শোকস্তব্ধএই বিষয়টাতে আমি নাড়া খেলাম সবচেয়ে বেশী মৃত্যু খুব সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ির জীবনে অভ্যস্ত আমাদের কাছে পাশের ফ্ল্যাটের কারোর মৃত্যুর চেয়ে ছোট ভাইয়ের আঙুলের চামড়া কাটলে বেশী কষ্ট লাগেঅথচ বছর দুই-তিনেক আগেও যাদের সাথে কখনও দেখা হয়নি, তাদের কারোর মৃত্যুতে শোক আর সমবেদনা এখানে সবার চোখেমুখে!

মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে
, অন্য প্রসঙ্গে আসিএতদিন জানা ছিলো মানুষের বন্ধু হয় চ্যাঙড়া বয়সেএখন মনে হয় সূত্র উল্টে গ্যাছে! পিংকসিটিতে আমার যত বন্ধুবান্ধব জোগাড় হয়েছে, তার থেকে বেশী যোগাড় হয়েছে আমার আব্বার! আম্মারও সঙ্গী-সাথী কম নয়! সন্ধের আগে আগে চাঁদের আলো ফুটলে দেখা যায় সবাই সবার বন্ধুমহলের সাথেএ যেন অনেকটা জসীমউদ্দীনের কবিতার পল্লীগ্রামের মতোএকটা বিরাট পরিবারের সবাই যেন দলে দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখানে ওখানেএক জায়গায় দেখা যাবে লাইট জ্বালিয়ে হাঁক-ডাক করে ব্যাডমিন্টন খেলছে ছেলেপেলের দল, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আলাপে ব্যস্ত সব বাড়ির কর্তারাঅনেক কর্ত্রীরাও সেরে নিচ্ছেন তাঁদের ইভিনিং ওয়াক, সমান তালে চলছে গল্পওএখান থেকে ওখানে যাই, সবার সাথেই চেনাহাত নাড়িয়ে সবাই জিজ্ঞেস করেন- ভালো তো?’ এবার যেন আমার সঠিক উপলব্ধি হলো, শহর কিংবা গ্রাম নয়, পিংকসিটি সত্যিকার অর্থে একটা বৃহৎ পরিবারআমরা সবাই আসলে এই বিশাল পরিবারের সদস্য হিসেবে যার যার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিএতক্ষণ লিখে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ করেই পিংকসিটির ছেলেপুরের দল টেনে ধরে নিয়ে গেলোওহহো, ভুলেই গিয়েছিলাম, আজকে তো বারবিকিউ পার্টি হবার কথা!

শীতের রাত
, বাতাসে পোড়া মুরগীর সুঘ্রাণ, আমরা বসে বসে আগুন তাপাচ্ছি পরক্ষণেই মনে হলো- আগুন না, আমিতো আসলে এখন সুখ তাপাইএকজন পিংকসিটিবাসীর সুখ


পুনশ্চ- পিংকসিটি বোধহয় ইদানিং ঢাকা শহরের কাছাকাছি চলে আসছে
কারণ এর আকাশে বেশ কয়েকটা কাক দেখা যাচ্ছেখুব কষ্টের সাথে বলতে হচ্ছে, এর আকাশ কেবল আর চড়ুই-শালিক কিংবা বাচ্চাদের ঘুড়ি ওড়ানোর আকাশ নয়, এটা এখন কাকেদেরও আকাশ!

শুক্রবার, ১১ নভেম্বর, ২০১১

ইছাপুরার হাটে এক সকালে...


এই সময়ের সকাল বেলায় ঘুমানোটা বেশ আরামেরবেশ শীত শীত একটা আমেজ আসেকোনমতে কাঁথাটা শেষরাতে গায়ে জড়িয়ে নিতে পারলেই হয়এরপরে দে ঘুমআজকেও তেমনই ঘুমাচ্ছিলামরসভঙ্গ হলো, কে যেন ধাক্কাধাক্কি করে ঘুমটা ভাঙিয়ে ফেললোতাকিয়ে দেখি আব্বা, ওরে-ব্বাপ! লাফ দিয়ে উঠলামকি ব্যাপার? ব্যাপার তেমন কিছু না, আজকে হাটবারআমাদের হাটে যেতে হবেপ্রথমে নিজের কানকেও বিশ্বাস হলো না, এই একবিংশ শতাব্দীর ঢাকা শহরে হাট? অবশ্য আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু আসে-যায় নাআব্বার ঠেলা-ধাক্কায় আমরা দুই ভাই আর আব্বা সহ তিনজন হাটুরে চললাম খিলক্ষেতের ছয়কিলো ভিতরে ইছাপুরার হাটেসেখানে প্রতি সপ্তাহের শুক্র আর সোমবার নাকি হাট বসে!

ইদানিংকার কোনকিছুই যেন যেমন হওয়া উচিৎ তেমন হয়নাচানাচুরওয়ালাকে ঠিক চানাচুরওয়ালা-চানাচুরওয়ালা মনে হয়না, বাসের কন্ডাকটরকে বাসের কন্ডাকটরের মতো লাগেনা, গ্রামকেও মনে হয় কিছুটা শহর শহর... সেদিক দিয়ে বরং এই হাটকে ঠিক আমাদের ছোটবেলার বইয়ে পড়া হাটের মতোই মনে হলোআর হাটের লোকজনকেও লাগলো হাটের লোকজনের মতোইঢোকার জায়গার সামনে দেখলাম দুধওয়ালা তার বড় কড়াইটাতে দুধ জ্বাল দিচ্ছে, আর গরম গরম গেলাস হাতে তার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকেইএই সাতসকালে চা না খেয়ে বরং দেখলাম দুধ খাবার প্রতি অনেকের ঝোঁক  অনেককেই দেখলাম ঝাঁকা ভর্তি করে বাজার সেরে বেরোচ্ছেবাজারের মতো ভাড়া করা মুটে তাদের বাজার বইছে না, প্রতি বাড়ি থেকেই কয়েকজন করে এসেছে হাটেআর দেরী না করে আমরাও ঢুকে পড়লাম হাটে

হাটের ভীড়টা সবজির দোকানের সামনেই বেশীসকাল সকাল খেতের থেকে তুলে আনা টাটকা সবজির সাথে এখনও যেন মিশে আছে ভোরের শিশিরশীতের নতুন সবজি হিসেবে ফুলকপি, বাঁধাকপি, সীম আর পুঁই শাকের বেশ রমরমাপাওয়া যাচ্ছে বেগুনী-সবুজ রঙের শালগমওভূল হলো, বেগুনী রঙের শালগমকে বলা হয় বীট। কেন বলা হয় তা অবশ্য আমি জানি না। নতুন ওঠা আলুরও দেখলাম বেশ কদরকেনাবেচায় সরগরম চারপাশপাশেই মাছের বাজারবালু নদীর থেকে বেরিয়ে আসা খাল বয়ে যাচ্ছে হাটের পাশ দিয়েইওখানেই এসে ভিড়েছে কয়েকটা মাছ মারার নৌকামানুষজন ভীড় করে মাছ টিপে-টুপে দেখছে, দরদামও চলছে মাছের বাজার নামটার সাথে সঙ্গতি রেখেইসেইসাথে পাল্লা দিয়ে চলছে মাছওয়ালাদের বিড়ি খাওয়াআমি লক্ষ্য করে দেখেছি- দেশের যে কোন বাজারেই যাওয়া হোক না কেন, বাজারের আর কেউ বিড়ি না খেলেও মাছওয়ালারা বিড়ি খাবেইআর তাদের এই বিড়ি খাওয়া দেখতেও কেমন জানি অস্বস্তি লাগেবোধহয় তাদের মাছভেজা হাতে বিড়ি খাওয়ার কারণেই

মাছের বাজার থেকে আমরা এবার চললাম হাটের অন্যদিকেশ্যামল মিত্রের পুতুলওয়ালার মতো একজন ঝুড়িভর্তি পুতুল নিয়ে বসে আছেপাশেই বসে জুতা সারাবার মুচিঅন্যদিকে বিশাল স্টল খুলে বসে আছে মনোহর দ্রব্যাদি বিক্রেতাকি নেই তার কাছে- মুখ দেখার আয়না, চুলের ফিতা, লিপস্টিক থেকে শুরু করে স্টেশনারী বইখাতা পর্যন্তএককোণে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন সবজির চারাগাছলোকে দরদাম করে কিনছেতালা সারাবার লোকও দেখলাম উপস্থিত হাটেপানের রসে লালমুখ করে বসে আছে পান-সুপারী বিক্রেতাএবার সামনে পেলাম মুরালীর দোকানছেলেপুলের দল বাবাকে যেভাবে ঘিরে ধরে মুরালি খাবে বলে, আমরা সেভাবেই আব্বাকে ঘিরে ধরলাম; যদিও ঠিক ছেলেপুলেবলার মতো বয়সটা আমাদের নেই!  আমরা মুরালি খেলাম, গরম গরম ভেজে তোলা জিলাপি খেলাম, সবশেষে গরুর দুধের চা খেলামবেলা বাড়ছে, সূর্যটাকে দেখা গেলো মাথার উপরে চলে এসেছেআমরাও আস্তে আস্তে চায়ের দোকান থেকে উঠে দাঁড়ালাম, হাটের গ্রামীণ পরিবেশে একটা চমৎকার হেমন্তের সকাল কাটিয়ে রওনা দিলাম ঢাকা শহরের দিকেতবে প্রথমবার হাট দেখার স্মৃতিটা সবসময়ের জন্যই মনে এক অন্যরকম জায়গা করে রইলো