এই সময়ের সকাল বেলায় ঘুমানোটা বেশ আরামের। বেশ শীত শীত একটা আমেজ আসে। কোনমতে কাঁথাটা শেষরাতে গায়ে জড়িয়ে নিতে পারলেই হয়। এরপরে দে ঘুম। আজকেও তেমনই ঘুমাচ্ছিলাম। রসভঙ্গ হলো, কে যেন ধাক্কাধাক্কি করে ঘুমটা ভাঙিয়ে ফেললো। তাকিয়ে দেখি আব্বা, ওরে-ব্বাপ! লাফ দিয়ে উঠলাম। কি ব্যাপার? ব্যাপার তেমন কিছু না, আজকে হাটবার। আমাদের হাটে যেতে হবে। প্রথমে নিজের কানকেও বিশ্বাস হলো না, এই একবিংশ শতাব্দীর ঢাকা শহরে হাট? অবশ্য আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কিছু আসে-যায় না। আব্বার ঠেলা-ধাক্কায় আমরা দুই ভাই আর আব্বা সহ তিনজন হাটুরে চললাম খিলক্ষেতের ছয়কিলো ভিতরে ইছাপুরার হাটে। সেখানে প্রতি সপ্তাহের শুক্র আর সোমবার নাকি হাট বসে!
ইদানিংকার কোনকিছুই যেন যেমন হওয়া উচিৎ তেমন হয়না। চানাচুরওয়ালাকে ঠিক চানাচুরওয়ালা-চানাচুরওয়ালা মনে হয়না, বাসের কন্ডাকটরকে বাসের কন্ডাকটরের মতো লাগেনা, গ্রামকেও মনে হয় কিছুটা শহর শহর... সেদিক দিয়ে বরং এই হাটকে ঠিক আমাদের ছোটবেলার বইয়ে পড়া হাটের মতোই মনে হলো। আর হাটের লোকজনকেও লাগলো হাটের লোকজনের মতোই। ঢোকার জায়গার সামনে দেখলাম দুধওয়ালা তার বড় কড়াইটাতে দুধ জ্বাল দিচ্ছে, আর গরম গরম গেলাস হাতে তার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকেই। এই সাতসকালে চা না খেয়ে বরং দেখলাম দুধ খাবার প্রতি অনেকের ঝোঁক। অনেককেই দেখলাম ঝাঁকা ভর্তি করে বাজার সেরে বেরোচ্ছে। বাজারের মতো ভাড়া করা মুটে তাদের বাজার বইছে না, প্রতি বাড়ি থেকেই কয়েকজন করে এসেছে হাটে। আর দেরী না করে আমরাও ঢুকে পড়লাম হাটে।
হাটের ভীড়টা সবজির দোকানের সামনেই বেশী। সকাল সকাল খেতের থেকে তুলে আনা টাটকা সবজির সাথে এখনও যেন মিশে আছে ভোরের শিশির। শীতের নতুন সবজি হিসেবে ফুলকপি, বাঁধাকপি, সীম আর পুঁই শাকের বেশ রমরমা। পাওয়া যাচ্ছে বেগুনী-সবুজ রঙের শালগমও। ভূল হলো, বেগুনী রঙের শালগমকে বলা হয় বীট। কেন বলা হয় তা অবশ্য আমি জানি না। নতুন ওঠা আলুরও দেখলাম বেশ কদর। কেনাবেচায় সরগরম চারপাশ। পাশেই মাছের বাজার। বালু নদীর থেকে বেরিয়ে আসা খাল বয়ে যাচ্ছে হাটের পাশ দিয়েই। ওখানেই এসে ভিড়েছে কয়েকটা মাছ মারার নৌকা। মানুষজন ভীড় করে মাছ টিপে-টুপে দেখছে, দরদামও চলছে মাছের বাজার নামটার সাথে সঙ্গতি রেখেই। সেইসাথে পাল্লা দিয়ে চলছে মাছওয়ালাদের বিড়ি খাওয়া। আমি লক্ষ্য করে দেখেছি- দেশের যে কোন বাজারেই যাওয়া হোক না কেন, বাজারের আর কেউ বিড়ি না খেলেও মাছওয়ালারা বিড়ি খাবেই। আর তাদের এই বিড়ি খাওয়া দেখতেও কেমন জানি অস্বস্তি লাগে। বোধহয় তাদের মাছভেজা হাতে বিড়ি খাওয়ার কারণেই।
মাছের বাজার থেকে আমরা এবার চললাম হাটের অন্যদিকে। শ্যামল মিত্রের পুতুলওয়ালার মতো একজন ঝুড়িভর্তি পুতুল নিয়ে বসে আছে। পাশেই বসে জুতা সারাবার মুচি। অন্যদিকে বিশাল স্টল খুলে বসে আছে মনোহর দ্রব্যাদি বিক্রেতা। কি নেই তার কাছে- মুখ দেখার আয়না, চুলের ফিতা, লিপস্টিক থেকে শুরু করে স্টেশনারী বইখাতা পর্যন্ত। এককোণে বিক্রি হচ্ছে বিভিন্ন সবজির চারাগাছ। লোকে দরদাম করে কিনছে। তালা সারাবার লোকও দেখলাম উপস্থিত হাটে। পানের রসে লালমুখ করে বসে আছে পান-সুপারী বিক্রেতা। এবার সামনে পেলাম মুরালীর দোকান। ছেলেপুলের দল বাবাকে যেভাবে ঘিরে ধরে মুরালি খাবে বলে, আমরা সেভাবেই আব্বাকে ঘিরে ধরলাম; যদিও ঠিক ‘ছেলেপুলে’ বলার মতো বয়সটা আমাদের নেই! আমরা মুরালি খেলাম, গরম গরম ভেজে তোলা জিলাপি খেলাম, সবশেষে গরুর দুধের চা খেলাম। বেলা বাড়ছে, সূর্যটাকে দেখা গেলো মাথার উপরে চলে এসেছে। আমরাও আস্তে আস্তে চায়ের দোকান থেকে উঠে দাঁড়ালাম, হাটের গ্রামীণ পরিবেশে একটা চমৎকার হেমন্তের সকাল কাটিয়ে রওনা দিলাম ঢাকা শহরের দিকে। তবে প্রথমবার হাট দেখার স্মৃতিটা সবসময়ের জন্যই মনে এক অন্যরকম জায়গা করে রইলো।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন