সোমবার, ২১ নভেম্বর, ২০১১

পিংকসিটিতে দিন-রজনী


(এই লেখাটা পিংকসিটি এজিএম ২০১১ এর জন্য বের হওয়া পত্রিকায় প্রকাশিত)
এখন থেকে প্রায় ছয় বছর আগের কথাআব্বা-আম্মা এক সন্ধ্যায় বাইরে থেকে বাসায় আসলেনআম্মার মুখে বিশ্ব জয় করার হাসিআব্বার মুখেও সারপ্রাইজ দেয়ার মুচকি মুচকি হাসিআমরা সবাই চেপে ধরলাম, ব্যাপারটা কি? দুই-এক মিনিট রহস্য-রহস্য ভাব রাখার পর তারা আর চেপে রাখতে পারলেন না, বলেই দিলেন- আমাদের নাকি একটা বাড়ি হতে যাচ্ছে, দোতলা বাড়িকোথায় হবে? খিলক্ষেতের ভেতর পিংকসিটিতেচটপট প্ল্যান হয়ে গেলো, আগামীকাল আমরা পিংকসিটিতে যাচ্ছি

পরদিন গেলাম পিংকসিটি
এখানকার সুপারভাইজার সাহেব আমাদের খুব খাতির করে নিয়ে গেলেন এক নদীর ধারেএরপর আঙুল তুলে বললেন, “ওই যে নদীর মাঝখানটা দেখতে পাচ্ছেন, ওইখানেই হবে আপনাদের বাড়িবাড়ির জায়গা দেখাতে পেরে সুপারভাইজারও খুশি, আমরাও খুশিতাড়াতাড়ি অফিসে গিয়ে প্রথম ডাউনপেমেন্ট পরিশোধ করলামতারপর খুশি উদযাপন করতে আমরা শিক-কাবাব কিনলাম, নান রুটি কিনলাম, কোক কিনলামবাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া হবেখুব ফুরফুরে আনন্দে বাসায় ফিরলামটিভি ছেড়ে সবাই খেতে বসলামটিভিতে তখন অ্যাড দেখাচ্ছে- এক লোক নদীর ধারে গিয়ে একটা ফ্যামিলিকে ঠিক আমাদের মতো করেই দেখাচ্ছে, “ওই যে নদীর মাঝখানটা দেখতে পাচ্ছেন, ওইখানেই হবে আপনাদের বাড়িএরপরই পর্দায় ভেসে উঠলো সতর্কবাণী- এইসব ধাপ্পাবাজীতে ভুলবেন নানগদ তৈরী বাড়িতে এখনই উঠে পড়ুন, আপনাদের সেবায় অমুক হাউজিং লিমিটেড!!! এই অ্যাড দেখার পর আমাদের সেদিনের শিক কাবাবের পার্টিটা আর তেমন জমলো না, গম্ভীর মুখে সবাই খাওয়া শেষ করলাম, একটা চাপা দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে গেলামপিংকসিটি নিয়ে আমাদের সুখ আর দুঃখ মেশানো দিন-রজনী আসলে সেদিন থেকেই শুরু হয়ে গেলো

এরপর দিন গড়িয়ে বেশ কিছু সময় গেলো
পানি ভরাট করে মাটি ফেলে একদিন সত্যি সত্যিই বাড়ি উঠে গেলো, আর সত্যি সত্যিই আমরা বাড়িতে উঠে এলামকিন্তু ওঠার পরদিন থেকেই মনে হলো আমরা মূল ঢাকা শহর থেকে একটু দূরে চলে এসেছিমনে হওয়ার কারণ দুটিপ্রথম কারণ, পিংকসিটিতে কোন কাক নেই! সত্যি সত্যিই নেই আজকাল গ্রামাঞ্চলেও কাক ডাকাডাকি করে, আর পিংকসিটির মতোন একটা মডেল টাউনে আমার প্রথম সকালে ঘুম ভাঙলো চড়ুইয়ের কিচিরমিচির শুনে! সারা জীবনে শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে কাকের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙার কু-অভ্যাস, হঠাৎ করেই চড়ুইয়ের মিষ্টি কিচিরমিচিরকেই মনে হলো রীতিমতো কর্কশআর দ্বিতীয় কারণ হলো আমাদের পেপারওয়ালাভুল হয়ে গেলো, বলা উচিৎ শাহী পেপারওয়ালাআজকাল মফস্বল শহরেও দৈনিক পত্রিকাগুলো সকাল দশটার মধ্যে সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়এখানে এগারোটার মধ্যে পেপার হাতে পেলেই মনে হয় মহা সৌভাগ্যবানআর ঈদ, বড়দিন, পূজা-পার্বন কিংবা নববর্ষের ছুটিগুলোও তিনি পালন করেন বেশ লম্বা লম্বা করেই

তাহলে পিংকসিটি কি একটা গণ্ডগ্রাম
? হলোই বা, নিজেকেই স্বান্তনা দেই- সারা বিশ্বটাইতো এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজএসব ভাবতে ভাবতে পিংকসিটির রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ দেখি গ্লোবাল ভিলেজ আমার চোখের সামনে! সামনেই ফুটবল নিয়ে খেলছে দুই বৃটিশ শিশু, এক বাড়ির লনে চিং-ওয়া-চু জাতীয় শব্দ করে ফোনে কথা বলছে এক চায়নিজ, রাস্তায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে কথা বলছে দুই নাইজেরিয়ান, বৈকালিক হাঁটাহাঁটিতে ব্যস্ত এক রাশিয়ান গৃহবধূমনের ভুল ধারণা শুধরে নিলামপিংকসিটিকে বরং বলা উচিৎ একটা ছোটখাট কসমোপলিটান সিটিএই ধারণা নিয়েই আবার হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বাসায়


কিন্তু কসমোপলিটন সিটির ধারণা আমার মনে খুব বেশীদিন টিকলো নাকারণ এরমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পিংকসিটি-বসুন্ধরা ধুড়ুম-ধাড়ুম যুদ্ধসন্ধ্যেবেলা গেটের দারোয়ানের কাছে মিনি ইন্টারভিউ দিয়ে ঢুকি, আর রাত্রিবেলা গুলি-গোলার শব্দ শূনে আল্লাহ-আল্লাহ করে কাটাইসন্দেহজনক চেহারার একগাদা লোক দিনরাত এসে ঘোরাঘুরি শুরু করলো, তাদের জন্য মহা আয়োজনে রান্নাবান্না হতে লাগলোগোটা পিংকসিটিটাকেই কেমন যেন দূর্গ-দূর্গ মনে হওয়া শুরু করলো, আর আমরা যেন সেখানকার অনাহূত দূর্গবাসীতবে বিপদের সময় বলেই বোধহয়, সবাই একসাথে এককাট্টা হয়ে গেলামআমাদের করণীয় সম্পর্কে ঘন ঘন মিটিং হতে লাগলো, সেইসাথে সবার সম্পর্কটাও যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠতে লাগলোঅবশ্য লড়াই শেষ হবার পর দূর্গ দূর্গ ভাবটা আর থাকলো না

একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে গিয়ে বেশ অবাক হলাম
পেল্লায় সাইজের আম কেটে রাখাআম কোথথেকে এলো? “পাশের বাসার ভাবী দিয়ে গেলেন” - আম্মার উত্তর কয়েকদিন পর রাতের বেলা খেতে গিয়ে দেখি কুমড়ো পাতার বড়া, সেটাও শুনলাম পাশের এক বাড়ি থেকে দিয়ে গ্যাছে! এইভাবে মাঝেমধ্যেই খাবার টেবিলে কিছু না কিছু থাকা শুরু করলোধীরে ধীরে আমাদের লাগানো গাছপালা-শাকসবজীগুলোও বড় হয়ে উঠলো আর আমরাও এই আদান-প্রদান সংস্কৃতির সাথে খুব ভালোভাবে যুক্ত হয়ে গেলাম ব্যাপারটা কেবল খাবার-দাবার আদান-প্রদানের মধ্যেই আটকে থাকলো নাপিংকসিটির মধ্যেই একজনের গায়ে-হলুদ হবে, আগেকার দিনের সিনেমায় মালকা বানুর বিয়েতে সারা গ্রাম যেমন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো গেট সাজাতে, তেমনি এইখানেও দেখলাম গেট সাজানো আর স্টেজ বানানো নিয়ে সবার দুশ্চিন্তা! খাওয়া-দাওয়ার তদারকির জন্য এবাড়ি-ওবাড়ি মিলিয়ে দশজন রেডি! এক বাড়িতে গৃহকর্তার আম্মা মারা গেছেন, মনে হলো সারা পিংকসিটি শোকস্তব্ধএই বিষয়টাতে আমি নাড়া খেলাম সবচেয়ে বেশী মৃত্যু খুব সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ির জীবনে অভ্যস্ত আমাদের কাছে পাশের ফ্ল্যাটের কারোর মৃত্যুর চেয়ে ছোট ভাইয়ের আঙুলের চামড়া কাটলে বেশী কষ্ট লাগেঅথচ বছর দুই-তিনেক আগেও যাদের সাথে কখনও দেখা হয়নি, তাদের কারোর মৃত্যুতে শোক আর সমবেদনা এখানে সবার চোখেমুখে!

মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে
, অন্য প্রসঙ্গে আসিএতদিন জানা ছিলো মানুষের বন্ধু হয় চ্যাঙড়া বয়সেএখন মনে হয় সূত্র উল্টে গ্যাছে! পিংকসিটিতে আমার যত বন্ধুবান্ধব জোগাড় হয়েছে, তার থেকে বেশী যোগাড় হয়েছে আমার আব্বার! আম্মারও সঙ্গী-সাথী কম নয়! সন্ধের আগে আগে চাঁদের আলো ফুটলে দেখা যায় সবাই সবার বন্ধুমহলের সাথেএ যেন অনেকটা জসীমউদ্দীনের কবিতার পল্লীগ্রামের মতোএকটা বিরাট পরিবারের সবাই যেন দলে দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখানে ওখানেএক জায়গায় দেখা যাবে লাইট জ্বালিয়ে হাঁক-ডাক করে ব্যাডমিন্টন খেলছে ছেলেপেলের দল, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আলাপে ব্যস্ত সব বাড়ির কর্তারাঅনেক কর্ত্রীরাও সেরে নিচ্ছেন তাঁদের ইভিনিং ওয়াক, সমান তালে চলছে গল্পওএখান থেকে ওখানে যাই, সবার সাথেই চেনাহাত নাড়িয়ে সবাই জিজ্ঞেস করেন- ভালো তো?’ এবার যেন আমার সঠিক উপলব্ধি হলো, শহর কিংবা গ্রাম নয়, পিংকসিটি সত্যিকার অর্থে একটা বৃহৎ পরিবারআমরা সবাই আসলে এই বিশাল পরিবারের সদস্য হিসেবে যার যার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছিএতক্ষণ লিখে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ করেই পিংকসিটির ছেলেপুরের দল টেনে ধরে নিয়ে গেলোওহহো, ভুলেই গিয়েছিলাম, আজকে তো বারবিকিউ পার্টি হবার কথা!

শীতের রাত
, বাতাসে পোড়া মুরগীর সুঘ্রাণ, আমরা বসে বসে আগুন তাপাচ্ছি পরক্ষণেই মনে হলো- আগুন না, আমিতো আসলে এখন সুখ তাপাইএকজন পিংকসিটিবাসীর সুখ


পুনশ্চ- পিংকসিটি বোধহয় ইদানিং ঢাকা শহরের কাছাকাছি চলে আসছে
কারণ এর আকাশে বেশ কয়েকটা কাক দেখা যাচ্ছেখুব কষ্টের সাথে বলতে হচ্ছে, এর আকাশ কেবল আর চড়ুই-শালিক কিংবা বাচ্চাদের ঘুড়ি ওড়ানোর আকাশ নয়, এটা এখন কাকেদেরও আকাশ!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন