(এই লেখাটা পিংকসিটি এজিএম ২০১১ এর জন্য বের হওয়া পত্রিকায় প্রকাশিত)
এখন থেকে প্রায় ছয় বছর আগের কথা। আব্বা-আম্মা এক সন্ধ্যায় বাইরে থেকে বাসায় আসলেন। আম্মার মুখে বিশ্ব জয় করার হাসি। আব্বার মুখেও সারপ্রাইজ দেয়ার মুচকি মুচকি হাসি। আমরা সবাই চেপে ধরলাম, ব্যাপারটা কি? দুই-এক মিনিট রহস্য-রহস্য ভাব রাখার পর তারা আর চেপে রাখতে পারলেন না, বলেই দিলেন- আমাদের নাকি একটা বাড়ি হতে যাচ্ছে, দোতলা বাড়ি। কোথায় হবে? খিলক্ষেতের ভেতর পিংকসিটিতে। চটপট প্ল্যান হয়ে গেলো, আগামীকাল আমরা পিংকসিটিতে যাচ্ছি।
পরদিন গেলাম পিংকসিটি । এখানকার সুপারভাইজার সাহেব আমাদের খুব খাতির করে নিয়ে গেলেন এক নদীর ধারে। এরপর আঙুল তুলে বললেন, “ওই যে নদীর মাঝখানটা দেখতে পাচ্ছেন, ওইখানেই হবে আপনাদের বাড়ি।” বাড়ির জায়গা দেখাতে পেরে সুপারভাইজারও খুশি, আমরাও খুশি। তাড়াতাড়ি অফিসে গিয়ে প্রথম ডাউনপেমেন্ট পরিশোধ করলাম। তারপর খুশি উদযাপন করতে আমরা শিক-কাবাব কিনলাম, নান রুটি কিনলাম, কোক কিনলাম। বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া হবে। খুব ফুরফুরে আনন্দে বাসায় ফিরলাম। টিভি ছেড়ে সবাই খেতে বসলাম। টিভিতে তখন অ্যাড দেখাচ্ছে- এক লোক নদীর ধারে গিয়ে একটা ফ্যামিলিকে ঠিক আমাদের মতো করেই দেখাচ্ছে, “ওই যে নদীর মাঝখানটা দেখতে পাচ্ছেন, ওইখানেই হবে আপনাদের বাড়ি।” এরপরই পর্দায় ভেসে উঠলো সতর্কবাণী- এইসব ধাপ্পাবাজীতে ভুলবেন না। নগদ তৈরী বাড়িতে এখনই উঠে পড়ুন, আপনাদের সেবায় অমুক হাউজিং লিমিটেড!!! এই অ্যাড দেখার পর আমাদের সেদিনের শিক কাবাবের পার্টিটা আর তেমন জমলো না, গম্ভীর মুখে সবাই খাওয়া শেষ করলাম, একটা চাপা দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। পিংকসিটি নিয়ে আমাদের সুখ আর দুঃখ মেশানো দিন-রজনী আসলে সেদিন থেকেই শুরু হয়ে গেলো।
এরপর দিন গড়িয়ে বেশ কিছু সময় গেলো । পানি ভরাট করে মাটি ফেলে একদিন সত্যি সত্যিই বাড়ি উঠে গেলো, আর সত্যি সত্যিই আমরা বাড়িতে উঠে এলাম। কিন্তু ওঠার পরদিন থেকেই মনে হলো আমরা মূল ঢাকা শহর থেকে একটু দূরে চলে এসেছি। মনে হওয়ার কারণ দুটি। প্রথম কারণ, পিংকসিটিতে কোন কাক নেই! সত্যি সত্যিই নেই। আজকাল গ্রামাঞ্চলেও কাক ডাকাডাকি করে, আর পিংকসিটির মতোন একটা মডেল টাউনে আমার প্রথম সকালে ঘুম ভাঙলো চড়ুইয়ের কিচিরমিচির শুনে! সারা জীবনে শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে কাকের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙার কু-অভ্যাস, হঠাৎ করেই চড়ুইয়ের মিষ্টি কিচিরমিচিরকেই মনে হলো রীতিমতো কর্কশ। আর দ্বিতীয় কারণ হলো আমাদের পেপারওয়ালা। ভুল হয়ে গেলো, বলা উচিৎ শাহী পেপারওয়ালা। আজকাল মফস্বল শহরেও দৈনিক পত্রিকাগুলো সকাল দশটার মধ্যে সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। এখানে এগারোটার মধ্যে পেপার হাতে পেলেই মনে হয় মহা সৌভাগ্যবান। আর ঈদ, বড়দিন, পূজা-পার্বন কিংবা নববর্ষের ছুটিগুলোও তিনি পালন করেন বেশ লম্বা লম্বা করেই।
তাহলে পিংকসিটি কি একটা গণ্ডগ্রাম ? হলোই বা, নিজেকেই স্বান্তনা দেই- সারা বিশ্বটাইতো এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজ। এসব ভাবতে ভাবতে পিংকসিটির রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ দেখি গ্লোবাল ভিলেজ আমার চোখের সামনে! সামনেই ফুটবল নিয়ে খেলছে দুই বৃটিশ শিশু, এক বাড়ির লনে চিং-ওয়া-চু জাতীয় শব্দ করে ফোনে কথা বলছে এক চায়নিজ, রাস্তায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে কথা বলছে দুই নাইজেরিয়ান, বৈকালিক হাঁটাহাঁটিতে ব্যস্ত এক রাশিয়ান গৃহবধূ। মনের ভুল ধারণা শুধরে নিলাম। পিংকসিটিকে বরং বলা উচিৎ একটা ছোটখাট কসমোপলিটান সিটি। এই ধারণা নিয়েই আবার হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বাসায় ।
পরদিন গেলাম পিংকসিটি । এখানকার সুপারভাইজার সাহেব আমাদের খুব খাতির করে নিয়ে গেলেন এক নদীর ধারে। এরপর আঙুল তুলে বললেন, “ওই যে নদীর মাঝখানটা দেখতে পাচ্ছেন, ওইখানেই হবে আপনাদের বাড়ি।” বাড়ির জায়গা দেখাতে পেরে সুপারভাইজারও খুশি, আমরাও খুশি। তাড়াতাড়ি অফিসে গিয়ে প্রথম ডাউনপেমেন্ট পরিশোধ করলাম। তারপর খুশি উদযাপন করতে আমরা শিক-কাবাব কিনলাম, নান রুটি কিনলাম, কোক কিনলাম। বাসায় ফিরে খাওয়া-দাওয়া হবে। খুব ফুরফুরে আনন্দে বাসায় ফিরলাম। টিভি ছেড়ে সবাই খেতে বসলাম। টিভিতে তখন অ্যাড দেখাচ্ছে- এক লোক নদীর ধারে গিয়ে একটা ফ্যামিলিকে ঠিক আমাদের মতো করেই দেখাচ্ছে, “ওই যে নদীর মাঝখানটা দেখতে পাচ্ছেন, ওইখানেই হবে আপনাদের বাড়ি।” এরপরই পর্দায় ভেসে উঠলো সতর্কবাণী- এইসব ধাপ্পাবাজীতে ভুলবেন না। নগদ তৈরী বাড়িতে এখনই উঠে পড়ুন, আপনাদের সেবায় অমুক হাউজিং লিমিটেড!!! এই অ্যাড দেখার পর আমাদের সেদিনের শিক কাবাবের পার্টিটা আর তেমন জমলো না, গম্ভীর মুখে সবাই খাওয়া শেষ করলাম, একটা চাপা দুশ্চিন্তা নিয়ে ঘুমাতে গেলাম। পিংকসিটি নিয়ে আমাদের সুখ আর দুঃখ মেশানো দিন-রজনী আসলে সেদিন থেকেই শুরু হয়ে গেলো।
এরপর দিন গড়িয়ে বেশ কিছু সময় গেলো । পানি ভরাট করে মাটি ফেলে একদিন সত্যি সত্যিই বাড়ি উঠে গেলো, আর সত্যি সত্যিই আমরা বাড়িতে উঠে এলাম। কিন্তু ওঠার পরদিন থেকেই মনে হলো আমরা মূল ঢাকা শহর থেকে একটু দূরে চলে এসেছি। মনে হওয়ার কারণ দুটি। প্রথম কারণ, পিংকসিটিতে কোন কাক নেই! সত্যি সত্যিই নেই। আজকাল গ্রামাঞ্চলেও কাক ডাকাডাকি করে, আর পিংকসিটির মতোন একটা মডেল টাউনে আমার প্রথম সকালে ঘুম ভাঙলো চড়ুইয়ের কিচিরমিচির শুনে! সারা জীবনে শহরের ফ্ল্যাটবাড়িতে কাকের ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙার কু-অভ্যাস, হঠাৎ করেই চড়ুইয়ের মিষ্টি কিচিরমিচিরকেই মনে হলো রীতিমতো কর্কশ। আর দ্বিতীয় কারণ হলো আমাদের পেপারওয়ালা। ভুল হয়ে গেলো, বলা উচিৎ শাহী পেপারওয়ালা। আজকাল মফস্বল শহরেও দৈনিক পত্রিকাগুলো সকাল দশটার মধ্যে সবার ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। এখানে এগারোটার মধ্যে পেপার হাতে পেলেই মনে হয় মহা সৌভাগ্যবান। আর ঈদ, বড়দিন, পূজা-পার্বন কিংবা নববর্ষের ছুটিগুলোও তিনি পালন করেন বেশ লম্বা লম্বা করেই।
তাহলে পিংকসিটি কি একটা গণ্ডগ্রাম ? হলোই বা, নিজেকেই স্বান্তনা দেই- সারা বিশ্বটাইতো এখন একটা গ্লোবাল ভিলেজ। এসব ভাবতে ভাবতে পিংকসিটির রাস্তা দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ দেখি গ্লোবাল ভিলেজ আমার চোখের সামনে! সামনেই ফুটবল নিয়ে খেলছে দুই বৃটিশ শিশু, এক বাড়ির লনে চিং-ওয়া-চু জাতীয় শব্দ করে ফোনে কথা বলছে এক চায়নিজ, রাস্তায় দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে কথা বলছে দুই নাইজেরিয়ান, বৈকালিক হাঁটাহাঁটিতে ব্যস্ত এক রাশিয়ান গৃহবধূ। মনের ভুল ধারণা শুধরে নিলাম। পিংকসিটিকে বরং বলা উচিৎ একটা ছোটখাট কসমোপলিটান সিটি। এই ধারণা নিয়েই আবার হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম বাসায় ।
কিন্তু কসমোপলিটন সিটির ধারণা আমার মনে খুব বেশীদিন টিকলো না। কারণ এরমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে পিংকসিটি-বসুন্ধরা ধুড়ুম-ধাড়ুম যুদ্ধ। সন্ধ্যেবেলা গেটের দারোয়ানের কাছে মিনি ইন্টারভিউ দিয়ে ঢুকি, আর রাত্রিবেলা গুলি-গোলার শব্দ শূনে আল্লাহ-আল্লাহ করে কাটাই। সন্দেহজনক চেহারার একগাদা লোক দিনরাত এসে ঘোরাঘুরি শুরু করলো, তাদের জন্য মহা আয়োজনে রান্নাবান্না হতে লাগলো। গোটা পিংকসিটিটাকেই কেমন যেন দূর্গ-দূর্গ মনে হওয়া শুরু করলো, আর আমরা যেন সেখানকার অনাহূত দূর্গবাসী। তবে বিপদের সময় বলেই বোধহয়, সবাই একসাথে এককাট্টা হয়ে গেলাম। আমাদের করণীয় সম্পর্কে ঘন ঘন মিটিং হতে লাগলো, সেইসাথে সবার সম্পর্কটাও যেন আরও গাঢ় হয়ে উঠতে লাগলো। অবশ্য লড়াই শেষ হবার পর দূর্গ দূর্গ ভাবটা আর থাকলো না।
একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে গিয়ে বেশ অবাক হলাম । পেল্লায় সাইজের আম কেটে রাখা। আম কোথথেকে এলো? “পাশের বাসার ভাবী দিয়ে গেলেন।” - আম্মার উত্তর। কয়েকদিন পর রাতের বেলা খেতে গিয়ে দেখি কুমড়ো পাতার বড়া, সেটাও শুনলাম পাশের এক বাড়ি থেকে দিয়ে গ্যাছে! এইভাবে মাঝেমধ্যেই খাবার টেবিলে কিছু না কিছু থাকা শুরু করলো। ধীরে ধীরে আমাদের লাগানো গাছপালা-শাকসবজীগুলোও বড় হয়ে উঠলো আর আমরাও এই আদান-প্রদান সংস্কৃতির সাথে খুব ভালোভাবে যুক্ত হয়ে গেলাম। ব্যাপারটা কেবল খাবার-দাবার আদান-প্রদানের মধ্যেই আটকে থাকলো না। পিংকসিটির মধ্যেই একজনের গায়ে-হলুদ হবে, আগেকার দিনের সিনেমায় মালকা বানুর বিয়েতে সারা গ্রাম যেমন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো গেট সাজাতে, তেমনি এইখানেও দেখলাম গেট সাজানো আর স্টেজ বানানো নিয়ে সবার দুশ্চিন্তা! খাওয়া-দাওয়ার তদারকির জন্য এবাড়ি-ওবাড়ি মিলিয়ে দশজন রেডি! এক বাড়িতে গৃহকর্তার আম্মা মারা গেছেন, মনে হলো সারা পিংকসিটি শোকস্তব্ধ। এই বিষয়টাতে আমি নাড়া খেলাম সবচেয়ে বেশী। মৃত্যু খুব সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ির জীবনে অভ্যস্ত আমাদের কাছে পাশের ফ্ল্যাটের কারোর মৃত্যুর চেয়ে ছোট ভাইয়ের আঙুলের চামড়া কাটলে বেশী কষ্ট লাগে। অথচ বছর দুই-তিনেক আগেও যাদের সাথে কখনও দেখা হয়নি, তাদের কারোর মৃত্যুতে শোক আর সমবেদনা এখানে সবার চোখেমুখে!
মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে , অন্য প্রসঙ্গে আসি। এতদিন জানা ছিলো মানুষের বন্ধু হয় চ্যাঙড়া বয়সে। এখন মনে হয় সূত্র উল্টে গ্যাছে! পিংকসিটিতে আমার যত বন্ধুবান্ধব জোগাড় হয়েছে, তার থেকে বেশী যোগাড় হয়েছে আমার আব্বার! আম্মারও সঙ্গী-সাথী কম নয়! সন্ধের আগে আগে চাঁদের আলো ফুটলে দেখা যায় সবাই সবার বন্ধুমহলের সাথে। এ যেন অনেকটা জসীমউদ্দীনের কবিতার পল্লীগ্রামের মতো। একটা বিরাট পরিবারের সবাই যেন দলে দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখানে ওখানে। এক জায়গায় দেখা যাবে লাইট জ্বালিয়ে হাঁক-ডাক করে ব্যাডমিন্টন খেলছে ছেলেপেলের দল, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আলাপে ব্যস্ত সব বাড়ির কর্তারা। অনেক কর্ত্রীরাও সেরে নিচ্ছেন তাঁদের ইভিনিং ওয়াক, সমান তালে চলছে গল্পও। এখান থেকে ওখানে যাই, সবার সাথেই চেনা। হাত নাড়িয়ে সবাই জিজ্ঞেস করেন- ‘ভালো তো?’ এবার যেন আমার সঠিক উপলব্ধি হলো, শহর কিংবা গ্রাম নয়, পিংকসিটি সত্যিকার অর্থে একটা বৃহৎ পরিবার। আমরা সবাই আসলে এই বিশাল পরিবারের সদস্য হিসেবে যার যার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি। এতক্ষণ লিখে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ করেই পিংকসিটির ছেলেপুরের দল টেনে ধরে নিয়ে গেলো। ওহহো, ভুলেই গিয়েছিলাম, আজকে তো বারবিকিউ পার্টি হবার কথা!
শীতের রাত , বাতাসে পোড়া মুরগীর সুঘ্রাণ, আমরা বসে বসে আগুন তাপাচ্ছি। পরক্ষণেই মনে হলো- আগুন না, আমিতো আসলে এখন সুখ তাপাই। একজন পিংকসিটিবাসীর সুখ।
একদিন সকালে নাস্তার টেবিলে গিয়ে বেশ অবাক হলাম । পেল্লায় সাইজের আম কেটে রাখা। আম কোথথেকে এলো? “পাশের বাসার ভাবী দিয়ে গেলেন।” - আম্মার উত্তর। কয়েকদিন পর রাতের বেলা খেতে গিয়ে দেখি কুমড়ো পাতার বড়া, সেটাও শুনলাম পাশের এক বাড়ি থেকে দিয়ে গ্যাছে! এইভাবে মাঝেমধ্যেই খাবার টেবিলে কিছু না কিছু থাকা শুরু করলো। ধীরে ধীরে আমাদের লাগানো গাছপালা-শাকসবজীগুলোও বড় হয়ে উঠলো আর আমরাও এই আদান-প্রদান সংস্কৃতির সাথে খুব ভালোভাবে যুক্ত হয়ে গেলাম। ব্যাপারটা কেবল খাবার-দাবার আদান-প্রদানের মধ্যেই আটকে থাকলো না। পিংকসিটির মধ্যেই একজনের গায়ে-হলুদ হবে, আগেকার দিনের সিনেমায় মালকা বানুর বিয়েতে সারা গ্রাম যেমন ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো গেট সাজাতে, তেমনি এইখানেও দেখলাম গেট সাজানো আর স্টেজ বানানো নিয়ে সবার দুশ্চিন্তা! খাওয়া-দাওয়ার তদারকির জন্য এবাড়ি-ওবাড়ি মিলিয়ে দশজন রেডি! এক বাড়িতে গৃহকর্তার আম্মা মারা গেছেন, মনে হলো সারা পিংকসিটি শোকস্তব্ধ। এই বিষয়টাতে আমি নাড়া খেলাম সবচেয়ে বেশী। মৃত্যু খুব সহজ ব্যাপার নয়, কিন্তু শহুরে ফ্ল্যাটবাড়ির জীবনে অভ্যস্ত আমাদের কাছে পাশের ফ্ল্যাটের কারোর মৃত্যুর চেয়ে ছোট ভাইয়ের আঙুলের চামড়া কাটলে বেশী কষ্ট লাগে। অথচ বছর দুই-তিনেক আগেও যাদের সাথে কখনও দেখা হয়নি, তাদের কারোর মৃত্যুতে শোক আর সমবেদনা এখানে সবার চোখেমুখে!
মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে , অন্য প্রসঙ্গে আসি। এতদিন জানা ছিলো মানুষের বন্ধু হয় চ্যাঙড়া বয়সে। এখন মনে হয় সূত্র উল্টে গ্যাছে! পিংকসিটিতে আমার যত বন্ধুবান্ধব জোগাড় হয়েছে, তার থেকে বেশী যোগাড় হয়েছে আমার আব্বার! আম্মারও সঙ্গী-সাথী কম নয়! সন্ধের আগে আগে চাঁদের আলো ফুটলে দেখা যায় সবাই সবার বন্ধুমহলের সাথে। এ যেন অনেকটা জসীমউদ্দীনের কবিতার পল্লীগ্রামের মতো। একটা বিরাট পরিবারের সবাই যেন দলে দলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখানে ওখানে। এক জায়গায় দেখা যাবে লাইট জ্বালিয়ে হাঁক-ডাক করে ব্যাডমিন্টন খেলছে ছেলেপেলের দল, একটু দূরে দাঁড়িয়ে আলাপে ব্যস্ত সব বাড়ির কর্তারা। অনেক কর্ত্রীরাও সেরে নিচ্ছেন তাঁদের ইভিনিং ওয়াক, সমান তালে চলছে গল্পও। এখান থেকে ওখানে যাই, সবার সাথেই চেনা। হাত নাড়িয়ে সবাই জিজ্ঞেস করেন- ‘ভালো তো?’ এবার যেন আমার সঠিক উপলব্ধি হলো, শহর কিংবা গ্রাম নয়, পিংকসিটি সত্যিকার অর্থে একটা বৃহৎ পরিবার। আমরা সবাই আসলে এই বিশাল পরিবারের সদস্য হিসেবে যার যার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি। এতক্ষণ লিখে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ করেই পিংকসিটির ছেলেপুরের দল টেনে ধরে নিয়ে গেলো। ওহহো, ভুলেই গিয়েছিলাম, আজকে তো বারবিকিউ পার্টি হবার কথা!
শীতের রাত , বাতাসে পোড়া মুরগীর সুঘ্রাণ, আমরা বসে বসে আগুন তাপাচ্ছি। পরক্ষণেই মনে হলো- আগুন না, আমিতো আসলে এখন সুখ তাপাই। একজন পিংকসিটিবাসীর সুখ।
পুনশ্চ- পিংকসিটি বোধহয় ইদানিং ঢাকা শহরের কাছাকাছি চলে আসছে । কারণ এর আকাশে বেশ কয়েকটা কাক দেখা যাচ্ছে। খুব কষ্টের সাথে বলতে হচ্ছে, এর আকাশ কেবল আর চড়ুই-শালিক কিংবা বাচ্চাদের ঘুড়ি ওড়ানোর আকাশ নয়, এটা এখন কাকেদেরও আকাশ!